৬ ডিসেম্বর, ২০২২
পড়তে মিনিট লাগতে পারে

ইন্ডিয়াতে 🇮🇳 ভ্রমণ সম্পর্কিত গাইডলাইন

শেয়ার করুনঃ

ইন্ডিয়া আমাদের পাশের দেশ হওয়াতে এবং একই দেশ থেকে বিভিন্ন রকমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও কালচারের স্বাদ নিতে পারার সুযোগ থাকার কারণে আমাদের বাংলাদেশীদের মধ্যে এটা খুবই পপুলার একটা ট্যুরিস্ট ডেসটিনেশন। পাশাপাশি মেডিকেলেও সুনাম থাকায় অনেকে ঐদেশে মেডিকেল পার্পাসেও ভিজিট করে থাকেন। আর রিসেন্টলি বিদেশিদের মধ্যে ওদের এডুকেশন সেক্টরও হিউজলি গ্রো করছে(এটা নিয়ে অন্যদিন কথা বলবো ইনশাআল্লাহ্‌)।

সোলাং ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ

তবে আমি ইন্ডিয়াতে যেহেতু ৪ বছর ছিলাম পড়াশোনা করার সুবাধে, তাই ভাবলাম আপনারা যারা ঘুরতে বা মেডিকেল পার্পাসে ইন্ডিয়াতে আসবেন তাদেরকে কমন কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি। আমার তথ্যগুলো প্রাইমারিলি নর্থ ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে, বাট আমি অনুমান করছি বাকি ইন্ডিয়াতেও কমবেশী এরকমই হবে।

শিমলা - হিমাচল প্রদেশ

বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া যাওয়া

প্রথমত বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া যাওয়া খুবই সহজ। বিমান, রেইল, বাস সবভাবেই ইন্ডিয়ার সাথে আমাদের কানেক্টিভিটি আছে। এখন ডিপেন্ড করছে আপনি কোনদিকে যাবেন সেটার উপর। তবে অবশ্যই ইমিগ্রেশনসহ নানান জটিলতার বিষয় সামনে রাখলে এয়ারে একদম হ্যাসেল ফ্রি, কোনো সমস্যাই হবে না, তারপর ট্রেইন, তারপর বাস।

বাংলাদেশ থেকে অনেক নামীদামী বাস বেনাপোল দিয়ে কলকাতা পর্যন্ত কাঁটা সার্ভিস দেয়। মানে বেনাপোল পর্যন্ত নিয়ে দিবে, তারপর আপনি নিজে ইমিগ্রেশন পার্ট শেষ করবেন দুই দেশেই। তারপর ঐপাশ থেকে আরেকটা গাড়িতে করে কলকাতা পর্যন্ত যাওয়া যায়।ডিরেক্ট ঢাকা-কলকাতার টিকেট কাটলে গাড়ি থেকেও ইমেগ্রেশন ক্রস করতে কিছুটা সহায়তা পাবেন।

অথবা সৌহার্দ্য নামে দুই দেশের ডিরেক্ট বাস সার্ভিসও আছে, সেইম বাসেই ঢাকা থেকে ডিরেক্ট কলকাতা যেতে পারবেন(ইমিগ্রেশনে কিছুটা সহায়তা পেলেও সেই নেমেই নিজে নিজে করতে হবে)।

বাট যারা কলকাতা যাবেন ঢাকা চট্টগ্রাম বা আশেপাশের কোনো এরিয়া থেকে তাদের জন্য আসলে বেনাপোল বা স্থলবন্দর ইউজ করা প্রেফার করি না। বাজেট যদি খুব বেশী সমস্যা না হয় তাহলে বাই এয়ারে বেস্ট সল্যুশান, সময় কম লাগবে আর ইমিগ্রেশন একদম হ্যাসেল ফ্রি।

অন্যদিকে ট্রেইনে আমার বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া যাওয়া হয়নি, বাট মোটামুটি হ্যাসেল ফ্রীই নাকি যতদূর শুনলাম। তাছাড়া ট্রেইনের ইমিগ্রেশন স্টার্টিং পয়েন্ট আর স্টপ পয়েন্টে হওয়াতে(জাস্ট লাইক বিমান) এটা বেশ সুবিধাজনক।

আর অন্য কোনো পোর্ট ইউজ করলে অপশন খুবই সীমাবদ্ধ, তাই যেগুলো আছে সেগুলোর মধ্যেই বেটার অপশন বাজেট অনুযায়ী চুজ করে নিতে পারেন।

হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোশিয়েন স্টেডিয়াম, যেটাকে আমরা চিনি ধরমশালা ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে পাহাড়ের উপরে ম্যাকলডগঞ্জ!

ইন্ডিয়াতে পা রেখেই যা যা করবেন

ইন্ডিয়াতে গিয়েই প্রথমেই সীম কালেক্ট করবেন। সাধারণত সীম কিনলে সাথে ডেইলি ১/১.৫ জিবি হিসেবে ১/৩ মাসের জন্য প্যাকেজও কিনতে পাওয়া যায় আর সাথে আনলিমিটেড টকটাইমও পাওয়া যায়, তাই পরবর্তিতে আর ইন্টারনেট বা কল করা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।

ইয়োলো ট্যাক্সি(খালি দেখবেন, তবে ইউজ করবেন উবার) — কলকাতা, ওয়েস্ট বেঙ্গল

ইন্টারনেট থাকা জরুরী, কারণ গুগল হচ্ছে ঐখানে আপনার সবচেয়ে কাছের ফ্রেন্ড। ইন্ডিয়াতে সাধারণত এয়ারটেল, জিও এর কভারেজ ভালো, তারপরেও যেখানে যাবেন সেখানে কোন অপারেটর ভালো সেটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।কে কি বললো না বললো সেটা শুনার দরকার নাই, জাস্ট গুগলের কথা শুনবেন।

তবে জম্মু-কাশ্মীরে একটু রেস্ট্রিকশন আছে, তাই ঐখানে একটু কষ্ট হতে পারে সীম কালেক্ট করা নিয়ে।

তারপর স্থলবন্দরের আশেপাশে থাকা মানি এক্সচেঞ্জ শপগুলোতে বেশিরভাগ সময়েই ভালো রেট পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে কারেন্সি কনভার্সেশনের দরকার পড়লে সেটা করে নিবেন সেখান থেকেই। তবে এয়ারপোর্টে গেলে এয়ারপোর্টে সব কারেন্সি কনভার্ট করবেন না, রেইট একদম কম থাকে সাধারণত। বেটার হয় সাথে অ্যাক্টিভ ডুয়েল কারেন্সি কার্ড রাখেন, টুকটাক রুপি লাগলে সেটা এটিএম থেকে তুলে, পজ পেইমেন্ট করে কাজ চালাতে পারবেন।

কলকাতা মারকুইস স্ট্রিটের অনেক হোটেলে(যেমনঃ কাস্তুরী) নানান কিসিমের ভর্তা পাওয়া যায়, গেলে খাওয়া মিস করবেন না!

ইন্ডিয়াতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া

ইন্ডিয়াতে বাস, ট্রেইন, বিমান মোটামুটি সব রিলায়েবল। আপনি এজেন্সির কাছে না গিয়ে নিজে নিজেই যেকোনো কিছুর টিকেট সহজেই কাটতে পারবেন। ডুয়েল কারেন্সি কার্ড থাকলে ক্রেডিট অপশন সিলেক্ট করে অলমোস্ট যেকোনো ওয়েবসাইট থেকেই টিকেট কেটে ফেলতে পারবেন নির্ধিদ্বায়। আর ভ্রমণের দুই-তিন সপ্তাহ বা তারও আগে সব টিকেট কেটে রেখে দিতে পারেন নিশ্চিন্তে থাকতে চাইলে, কারণ রাশ হয়ে গেলে অনেক রুটেই টিকেট পাওয়া টাফ হয়ে যেতে পারে।

বাগসুনাগ ওয়াটারফল — ম্যাকলডগঞ্জ, হিমাচল প্রদেশ

বিমান ইউজ করা

বিমানে মুভ করলে ইন্ডিয়াতে আমি ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স প্রেফার করি, এদের টাইমটেবিল থেকে শুরু করে বাকিসব বেশ ভালো মেইন্টেইন করে এবং বাজেট এয়ারলাইন্স(অ্যাভয়েড স্পাইসজেট বিপদে না পড়লে)। টিকেট পাবেন এয়ারলাইন্সের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে, অথবা এগুলোও বেশ ভালোঃ EaseMyTrip, Goibibo, Yatra, MakeMyTrip ইত্যাদি ইত্যাদি।এগুলোর মধ্যে অনেকে লোকাল ফোন নাম্বার ছাড়া রেজিস্ট্রেশন করতে দেয় না, অনেকে ইন্টারন্যাশনাল নাম্বারও অ্যাক্সেপ্ট করে। তাই আপনার সুবিধামতো জায়গা থেকে টিকেট কাটবেন।

ম্যাকলডগঞ্জ এর শ্বাসরুদ্ধকর পাহাড় এর ভিউ — ম্যাকলডগঞ্জ, হিমাচল প্রদেশ

ট্রেইন ইউজ করা

ট্রেইনের টিকেট লাগলে ওদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট irctc.co.in থেকেই কাটতে পারবেন নির্ধিদ্বায়, আর থার্ড পার্টি কারো কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নাই। ট্রেইনেও সীটের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন বাজেটের টিকেট পাবেন। তবে টয় ট্রেইন ইউজ করতে চাইলে আলাদা জায়গা থেকে টিকেট কালেক্ট করতে হতে পারে টয় ট্রেইনের ধরন বুঝে। আবার অনেক ডেসটিনেশনে মেট্রো, লোকাল ট্রেইনও এভেইলেবল আছে যেগুলোর টিকেট ডিরেক্ট কাউন্টার থেকেই নিতে পারবেন।

শিয়ালদহ স্টেশন — কলকাতা, ওয়েস্ট বেঙ্গল

বাস ইউজ করা

এবার আসি বাসে ভ্রমণ সম্পর্কে, এটা একটু ভাবনার বিষয় আপনি কোনটা প্রেফার করেন সেটার উপর। ইন্ডিয়াতে মোটামুটি সব জায়গাতেই ISBT(Inter State Bus Terminal) আছে। ওদের সরকারী(Govt. Bus) যত গাড়ি আছে(সাথে বেশ কিছু প্রাইভেট কোম্পানীর বাসও) আইএসবিটিতে আসবে এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের প্ল্যাটফর্মে এসে দাড়াবে, এবং প্ল্যাটফর্মের সাথেই টিকেট কাউন্টার থাকবে বা অনেকে বাসেই আপনাকে টিকেট দিবে।

হিমাচল প্রদেশের সরকারী বাস HRTC Volvo শিমলা টুটিকান্দি আইএসবিটিতে দিল্লীর ভলভো প্ল্যাটফর্মের অপেক্ষমাণ যাত্রী নেওয়ার জন্য।

সরকারি বাসগুলো অলমোস্ট সবগুলোই আইএসবিটি ইউজ করে, তাই আমি প্রেফার করি সরকারি বাসের টিকেট কেনার চেষ্টা করতে। কিন্তু সমস্যা আছে কয়েকটা এখানেঃ প্রথমত সরকারি লাক্সারিয়াস(ভলবো, স্ক্যানিয়া, মার্সেডিজ) বাসের টিকেট সচরাচর আগেভাগে শেষ হয়ে যায়, তাই আগে থেকে কনফার্ম না করে রাখলে অনলাইনে টিকেট পাওয়া যাবে না, কাউন্টারে গিয়েও পছন্দমতো সীট বা বেশী মানুষ থাকলে সীট পাওয়া টাফ হয়ে যাবে।

রাজস্থানের সরকারী বাস RSRTC চন্দিগড়ের সেক্টর ৪৩ আইএসবিটির শিমলার এসি বাস কাউন্টার/প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী নেওয়ার জন্য।

আরেকটা সমস্যা হলো সরকারি বাসগুলো সাধারণত তাদের জনগণের সেবা দেওয়া জন্যই থাকে, তাই পথিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় আইএসবিটি এরা ধরতে ধরতে যাবে। এখন আইসবিটিগুলো আবার বেশ বড়সড় আলাদা জায়গায় হয়, তাই ঐখানে ঢুকে, নিজের প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করাতে করাতে একটু ডিলে হতে পারে, বাট এমনিতে হ্যাসেলের কিছু থাকে না অধিকাংশ সময়েই।

চন্দিগড়ের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট Chandigarh Transport Undertaking(CTU) সেক্টর ১৭ আইএসবিটির একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী নেওয়ার জন্য

আর সুবিধা হলো আইএসবিটিগুলো আপনার ওয়েল কানেক্টেড থাকে। আপনি বিভিন্ন জায়গা থেকে আইএসবিটিতে ইজিলি আসতে যেতে পারবেন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইউজ করে। আবার আইএসবিটির ভিতরে মোটামুটি ব্যাসিক ফ্যাসিলিটিস সব থাকে, আবার নিশ্চিন্তে আপনি গাড়িতেও উঠতে নামতে পারবেন, যত্রতত্র থেকে উঠাবেও না, নামারও প্রয়োজন হবে না।

আর অন্যদিকে প্রাইভেট বাসের ক্ষেত্রে আপনি টিকেট মোটামুটি যেদিনেরটা ঐদিনই কোনো না কোনো বাসে পেয়ে যাবেন। ওদের অনেক প্রাইভেট বাস আছে দেখলাম লাইভ ট্র্যাকিংসহ আরো অনেক সুবিধা অ্যাড করেছে, যদিও আমি খুব কমই প্রাইভেট বাসে চড়েছি, যতবার চড়েছি ততবার Zingbus নামে একটা প্রাইভেট কোম্পানির বাসে চড়েছিলাম। এদের লাইভ ট্র্যাকিং, পরবর্তি গন্তব্য, বিরতির সময় ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে শুরু করে বেশ কিছু লাইভ ট্র্যাকিং রিলেটেড সুবিধা ছিলো।

তবে প্রাইভেট বাসের অন্যতম অসুবিধা হলো এরা অধিকাংশই আইএসবিটি ইউজ করে না, আপনাকে বিভিন্ন লোকেশনে, এদের লাউঞ্জে, আবার অনেক সময় রাস্তার মাঝখান থেকে উঠতে হবে। এসব জায়গাগুলো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট দ্বারা ওয়েল কানেক্টেড থাকে না, লাউঞ্জও অনেকসময় কোনোরকম একটা দোকান টাইপের, আইএসবিটির মতো বিশালাকার হয় না। নামবার সময়েও সেইম অবস্থা হবে, যত্রতত্র নামিয়ে দেয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে(বাট আমাদের দেশের মতো তড়িঘড়ি করে না অবশ্যই, সুন্দর করে রিল্যাক্সেই উঠতে নামতে পারবেন)। তবে অন্যতম সুবিধা হলো বেশীরভাগ বাস ডিরেক্ট চলে যায়, পথিমধ্যে কোনো স্টেশন ধরে না, ধরলেও তার নির্দিষ্ট রুটের মধ্যে সবচেয়ে কাছের যেটা ঐদিকও দিয়েই যাত্রী তুলে বা নামিয়ে চলে যাবে।

বাসের টিকেট কাঁটার জন্য সরকারি বেসরকারি সবার নিজস্ব ওয়েবসাইট ইউজ করতে পারবেন, অথবা কমন কিছু ওয়েবসাইটে একসাথে সবাইকে পাবেনঃ Yatra, Goibibo, AbhiBus, Redbus ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গা থেকে। অনেক সরকারি বাস আছে আবার এই কমন প্ল্যাটফর্মগুলতে টিকেট বিক্রি করে না, ওদের ওয়েবসাইটে থেকেই নিতে হয়, আবার ওদের ওয়েবসাইট আমাদের দেশে চলে না। সেক্ষেত্রে দেশ থেকে চাইলে ভিপিএনই ইউজ করে একটু কষ্ট করে টিকেট কালেক্ট করতে হবে আর কি!

ইতমাদ-উদ-দৌলা বা মিনিতাজ নামে পরিচিত ঠিক তাজমহলের পিছনে ইয়ামুনা(যমুনা) নদীর ঐপারে — আগ্রা, উত্তরপ্রদেশ

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে বিমান, ট্রেইন, বাসের কোনকিছুর ক্ষেত্রেই লেইট করা গ্রহণযোগ্য না, ১-২ মিনিট লেইট হওয়া মানে ৯৫% শিউর থাকেন যে আপনি এটা মিস করছেন। প্রাইভেট বাসের ক্ষেত্রে অনেকসময় রিকোয়েস্ট করলে ৫-১০ মিনিট ওয়েটও করতে পারে বাট এটা যার যার উপর নির্ভর করে আর কি। ওভারল লেইট না করাটাই বেস্ট।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে ঐখানে টিকেট মিকেট-থেকে শুরু করে যাবতীয় সবকিছুর সফট কপিই চলে, তাই টিকেটের হার্ড কপি করার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য দৌড়াদৌড়ি না করলেও চলবে।

ক্যাপশন না দিলেও চলবে — আগ্রা, উত্তরপ্রদেশ

তবে এতকিছু না করে চাইলে কিন্তু পার্সোনাল ক্যাব/গাড়ি বুক করেও এরকম লং ডিসটেন্সে এক জায়গা থেকে আরেকজায়গায় বা কমপ্লিট ঘোরাঘুরি সেরে ফেলতে পারবেন। সেক্ষেত্রে যে হোটেল নিবেন সেখানে পার্কিং থাকলে গাড়িটা পার্ক করাতে পারবেন অথবা পেইড পার্কিং এ গাড়ি পার্ক করে রাখতে পারবেন। সাথে পাঠানো ড্রাইভার গাড়িতেই থাকবে, সেখানেই সব করবে বা উনার নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিবে, এটা নিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে না।

কাসৌলি — হিমাচল প্রদেশ

লোকাল সাইট ভিজিটিং

তারপর কোনো প্লেসে থাকতে চাইলে, ঘুরতে যেতে চাইলে বা কোনো বিজনেস হলে অবশ্যই গুগুলে রিভিউ দেখে নিবেন। গুগলে যা দেখবেন বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটার মিল পাবনে।

চেনাব(লোকালরা ডাকে চন্দ্রভাগা) নদীর উপর নির্মিত অসংখ্য এমন ব্রীজের মধ্যে একটি ব্রীজ

হোটেল গিয়ে স্পটেও বুক করতে পারবেন(অবশ্যই গুগল থেকে রিভিউ দেখে যাবেন, শুধু রেটিংস দেখলে হবে না অ্যাকচুয়াল রিভিউ পড়লেই আইডিয়া পাবেন হোটেল কেমন), অথবা Oyorooms, Agoda, Booking.com, Airbnb বা আরো অনেক ওয়েবসাইট থেকে বুক করেও যেতে পারেন অথবা এদের থেকে রেইট জেনে আইডিয়া নিয়ে নিতে পারেন স্পট বুকিং এর জন্য। শহর, মেট্রোসিটিগুলোতে হোটেলে, খাবারে জিএসটি(ভ্যাট, ট্যাক্স হ্যানত্যান লাগে)। তাই এগুলোসহ প্রাইজ নাকি এগুলো ছাড়া সেটাও আগে ডিসকাস করে নিবেন।

ইন্ডিয়ার কিছু জায়গা আছে ঐখানকার লোকজন একটু স্ক্যামিং করতে পছন্দ করে। বাট স্ক্যাম করলেও খুব বেশী বা অতিমানবীয় কিছু করবে না। এরা অন্ততঃ এটুকু ধারনা রাখে যে ট্যুরিস্ট না আসলে এদের পেট চলবে না, তাই হয়তো অল্প একটু এদিক ওদিক করতে পারে বাট বড়সড় কোনো অঘটন ঘটাবে না শিউর থাকতে পারেন। বাট ট্যাক্সি ড্রাইভারগুলো একটু ঝামেলা করে, অটো, সিএনজির ড্রাইভারগুলোও সেইম অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

তাই গুগল ইউজ করে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইউজ করার চেষ্টা করবেন, গুগলে ডিরেকশন দিলেই আপনার আপনার জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এভেইলেবল আছে কিনা সেটা দেখতে পারবেন। অথবা কাউকে(অবশ্যই ট্যাক্সি বা সিএনজি ড্রাইভার ছাড়া) জিজ্ঞাসা করে নিবেন তাহলে উত্তর পেয়ে যাবেন।

ইয়ামুনা(যমুনা) নদী তার উৎপত্তিস্থলে উত্তরখণ্ডে — মাসৌরী, উত্তরখণ্ড

তবে ঐখানে লোকাল ট্রান্সপোর্টের জন্য অলওয়েজ Uber, Ola, Rapido এগুলো ইউজ করতে পারেন, কোনো সমস্যায় পড়লে বা ড্রাইভার সমস্যা সৃষ্টি করলে(অধিকাংশ ক্ষেত্রেই করে না, কারণ কোম্পানিগুলো এদেরকে ভালোই টাইট দিয়ে রাখে) আপনি ওদের সাপোর্টে কন্ট্যাক্ট করলেই সমাধান পেয়ে যাবেন।

অনেকসময় ওলা উবার ড্রাইভাররা আপনার গন্তব্যে একটু বেশী ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নিয়ে গিয়ে, ট্রিপে থাকা অবস্থায় পেট্রোল পাম্পে গিয়ে টাইম ওয়েস্ট করে আপনার ভাড়া বাড়িয়ে দিবে, আপনি ওদেরকে হয়তো স্লাইটলি ওয়ার্ন করতে পারেন যে আমি উবারকে জানালে উবার কিন্তু বেস ফেয়ার রেখে বাকিটা ফেরত দিয়ে দিবে, তাই এগুলো করবেন না। অথবা নেমে উবার সাপোর্টে জানাবেন আর সাথে সাথে আপনার বেস ফেয়ার রেখে বাকী এক্সট্রা টাকা ফেরত দিয়ে দিবে। তাছাড়া কোনো আইটেম লস্ট হলে বা অন্যান্য প্রবলেমেও উবার থেকে বেশ ভালো সাপোর্ট পাওয়া যায়।

৩০০০ মিটার উপরে বানানো বিশ্বের সবচেয়ে বড় অল সিজন টানেল(Atal Tunnel), হিমাচল প্রদেশের কুল্লু ডিসট্রিক্টকে কানেক্ট করেছে লাহৌল-স্পিতি ডিসট্রিক্ট এর সাথে।

ওভারল লোকাল ট্যাক্সি সিএনজি থেকে উবার ওলাতেই ভাড়া সবচেয়ে কম পাবেন। তবে টুরিস্টি ডেস্টিনশনে ওলা উবার বা এই টাইপের কিছু পাবেন না, থাকলেও দূর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এগুলো কোনো কাজেরই না। সেখানে আপনাকে এভাবেই ট্যাক্সি নিতে হবে, অথবা চাইলে পাবলিক ট্রান্সপোর্টও ইউজ করতে পারেন।

তবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর টাইম মিলানো বা খুব অপ্রতুল হওয়াতে ঐসব জায়গায় পার্সোনাল ক্যাব/ট্যাক্সি বুক করে নেওয়াই বেটার। অধিকাংশ সময়েই এদের ফিক্সড রেইট থাকে বা সবার রেইট কাছাকাছিই হয়। ফিক্সড হলে তো আর কিছু করার নাই, বাট না হলে দামাদামি নেগোশিয়েট করে উঠবেন কোনো সমস্যা নাই। বাট উঠার আগে বা বুক করার আগে বিস্তারিত ডিসকাস করে নিবেন অবশ্যই, কথায় যা বলবেন কাজেও তাই হবে তাই আগেভাগেই সব ডিসকাস করে নেওয়া ভালো হবে।

আর যদি যেখানে আছেন সেখানকার লোকাল ল্যাংগুয়েজ অথবা হিন্দী পারেন তাহলে সেটা কনফিডেন্টলি ইউজ করার চেষ্টা করবেন, অথবা ইংলিশে ও ভাঙা ভাঙা হিন্দীতেও সব জায়গায় মোটামুটি কমবেশী চলে যাবে। তবে লোকাল ল্যাংগুয়েজ বা হিন্দী বললে একটু এডভান্টেজ পাবেন আমার অভিজ্ঞতামতে।

কেম্পটি ওয়াটারফল — মাসৌরী, উত্তরখণ্ড

পার্সোনাল যানবাহন ভাড়া নেওয়া

রয়েল্ড এনফিল্ড হিমালায়ান এডিশনও ভাড়ায় পাওয়া যায়

আরেকটা কথা না বললেই নয় যে অনেক জায়গায় পার্সোনাল বাইক স্কুটার দিন হিসেবে ভাড়া পাওয়া যায়(ফুয়েল আপনার), স্পেশালি মানালিতে বাইক/স্কুটার চালাইতে পারলে ভাই আর অপশন না খোঁজাই বেটার। নিজের মনমতো যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘুরে বেড়াবেন, যা ইচ্ছা করবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। একইসাথে অনেক জায়গা থেকে গাড়িও ড্রাইভ করার জন্য ভাড়ায় পেতে পারেন। তবে অবশ্যই এগুলোর জন্য আপনার কাছে লিগ্যাল ডকুমেন্টস(ড্রাইভিং লাইসেন্স অবশ্যই) থাকা লাগবে।

বাইকে করে লাহৌল-স্পিতির কোকসার ঘোরাঘুরি

একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম ভিজিটরের জন্য সেইফ কি?

আরেকটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো অনেকেই ইন্ডিয়াতে মুসলিম হওয়ার কারণে ডিসক্রিমিনেশন এর শিকার হতে পারে এরকম চিন্তায় থাকতে পারেন। বাট ওভারল ইন্ডিয়া আসলে এমন না আর আপনি ঐখানে টোটালি পর্দা, হিজাব মেইন্টেইন করে একজন মুসলিম হিসেবে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবেন। স্পেশালি যখন টুরিস্ট অথবা মেডিকেলের কাজে যাবেন আপনার তো আর কিছু আসলে নাই ঐখানে করার বা পাবার, তাই এগুলো কোনো ম্যাটারই না।

তাদের কালচার খুবই ডাইভার্স আর তারা এগুলোর সাথে বেশ পরিচিত। তারপরেও একটা জায়গায় একটা গ্রুপ মেজরিটি হলে কিছু কিছু জিনিস উইয়ার্ড লাগতে পারে, বাট এটাই আসলে বিশেষত্ব, এগুলো আপনাকে পাবে না, ধরবেও না তাই এগুলো গায়ে নিবেন না। আমাদের দেশে যেমন মুসলিম মেজরিট হওয়াতে আজান, সালাম, ওয়াজ, দোয়া-কালাম এটা সেটা প্রচলিত, ঐখানেও(বা সব জায়গাতেই) এরকম ওদের ধর্ম অনুযায়ী কিছু প্রচলিত জিনিস দেখবেন। এগুলো টোটালি এক্সপেক্টেড, এরজন্য আপনাকে ভয় পেতে হবে না অথবা এক্সট্রা কোনোকিছু চিন্তাও করতে হবে না।

নর্থ ইন্ডিয়াতে এই টাইপের হালাল বিরিয়ানি পাওয়া যায়

তবে হালাল-হারাম ফুড যাচাই-বাছাই করে খাবেন। হালাল ফুড না পেলে ভেজ(Veg) খাবার নিশ্চিন্তে খেতে পারেন। আর হালাল হলে তো সবই খেতে পারবেন কোনো সমস্যা নাই। কোনো জায়গায় হালাল ফুড হলে স্পেসেফিকভাবে মেনশন করা থাকবে হালাল ফুড, ৭৮৬ ইত্যাদি ইত্যাদি, আর না থাকলে কিছুই লেখা থাকবে না। তাই শুধুশুধু কাউকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন হবে না।

আশা করি আমার এই পোস্ট আপনাদের ইন্ডিয়াতে ঘোরাঘুরি সম্পর্কে একটা ওভারল আইডিয়া দিবে। আমি কোনো স্পেসিফিক প্লেস মেনশন করি নাই কারণ আমার জানামতে পুরা ইন্ডিয়াতেই কমবেশী এরকম পাবেন। তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে নর্থ ইন্ডিয়াতেই ছিলাম আর সেখানকার এক্সপেরিয়েন্স নিয়েই আপনাদেরকে এগুলো সাজেস্ট করলাম।

তবে নিজে নিজে এসব করতে না চাইলে অলওয়েজ ট্রাস্টেড ট্রাভেল এজেন্সি ধরেও যেতে পারেন, নিজে নিজে রএক্সপেরিয়েন্স নিতে চাইলে আমার এটা ফলো করতে পারেন।

তবে একটা প্লেসকে বা দেশকে র ভাবে এক্সপেরিয়েন্স করতে চাইলে এরচাইতে ভালোভাবে আর সম্ভব না, আশা করি সেক্ষেত্রে আমার এই লেখাটা কাজে আসবে। কাজের মনে হলে সবার সাথে শেয়ার করতে পারেন, ধন্যবাদ!

** এই পোস্টে দেওয়া ছবিগুলো সব আমার বা আমাদের বন্ধুদের ট্যুরে গিয়ে তোলা ছবি। কেউ ইউজ করতে চাইলে অবশ্যই ক্রেডিট(Photo by zonayedpca) দিতে হবে, ধন্যবাদ!

ট্যাগঃ
শেয়ার করুনঃ